করেনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা অনেক অভিভাবক জানিনা শিশুর ব্যাপারে কি কি করোনীয়। তারাই এখন সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কুষ্টিয়া ও রাজশাহীতে ৪৫ দিন বয়স্ক দুইটি শিশু হাসপাতালে মমূর্ষ অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন।
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের শিশু বিভাগের নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল কবীর। তিনি এমবিবিএস ও ডিসিএইচ ডিগ্রীধারী। মালয়েশিয়া থেকে শিশুরোগের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি কয়েক পর্বে শিশুদের জন্য করোনায় করোনীয় সর্ম্পকে অনলাইন পোর্টাল “বাংলার গেজেট” সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশিত হলো :

করোনার এই ডামাডোলে বড়রাই এখন কুপোকাত। তার উপর নবজাতক শিশুদের নিয়ে তৈরী হয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। অনেকেই বুঝতে পারছেন না সদ্য ভূমিষ্ট এই মানব শিশুটির কি কি করনীয়। কিভাবে তাকে টেক কেয়ার করতে হবে। করোনা আক্রান্ত ফ্যামিলিতে শিশুটিকে বুকের দুখ খাওয়ানোর কি নিয়ম বা টিকা দিতে হবে কি হবে না এরকম নানান প্রশ্ন ও উৎকন্ঠা।
প্রশ্ন : গর্ভবতী মায়ের দ্বারা অনাগত সন্তানের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে কি না?
ডা. কবীর : আসলে এ রকম প্রমান এখন পর্যন্ত হাতে নেই। এটা নিয়ে এখনো গবেষনা চলছে। তবে ঝুকি কমানোর জন্য গর্ভবতী মাকে এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি সর্তকতার সাথে মেনে চলতে হবে। এছাড়া জরুরী প্রয়োজনে বা করোনার কোন লক্ষন দেখা দিলে দ্রুততার সাথে কাছাকাছি কোন হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।
প্রশ্ন : করোনার এই ক্রান্তিকালে নবজাতক শিশুদের টেককেয়ারটা কেমনভাবে করতে হবে বলে মনে করেন?
ডা. কবীর : ক) নবজাতক শিশুর টেককেয়ারের জন্য বড়দের মতই একই রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
খ) তাছাড়া নবজাতক শিশু জন্মের পরপরই পরিষ্কার শুকনো গরম কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখতে হবে। প্রসাব-পায়খানা করলে সংগে সংগে চেঞ্জ করে দিতে হবে।
গ) শিশুর কাছে বেশী লোকের ভীড় করা যাবে না। বেশী লোকের কোলে নেওয়া যাবে না।
ঘ) নবজাতকের গালে মুখে চুমু খাওয়া যাবে না
ঙ) যারা নবজাতক শিশুর টেককেয়ার করবেন তাদেরকেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ বাচ্চা কোলে নেবার আগে প্রতিবার নিজের হাত সাবান-পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে ধুতে হবে। এরপর স্যানিটাইজার হাতে মাখিয়ে নিয়ে তা শুকানোর পর হাত গরম করে বাচ্চাকে ধরতে হবে। সাথে মাস্কও পরতে হবে।
চ) মাকেও একইভাবে হাত মুখ পরিষ্কার করার পর বাচ্চাকে কোলে নিতে হবে।
ছ) বাচ্চাকে তার চাহিদামত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। তাতে বাচ্চার ক্ষুধা নিবারণ হবে। পাশাপাশি তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
জ) বাচ্চার সামনে কোনভাবেই হাচি-কাশি দেওয়া যাবে না।
ঝ) বাচ্চা ও মায়ের বিছানায় কেউ যেন না বসে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। কারণ বাচ্চা ও মা দুজনেই কিন্তু ঝুকির মধ্যে থাকে তখন।
ঞ) নবজাতক শিশুর সামান্য সর্দি-কাশি-জ্বর দেখা দিলে তাৎক্ষনিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শমত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
ট) পাশাপাশি মায়েরও যদি এ রকম সমস্যা দেখা দেয় তাকেও চিকিৎসা করাতে হবে।

প্রশ্ন : করোনা আক্রান্ত মা কি তার নবজাতক শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারবে?
ডা. কবীর : হ্যা পারবে। তাতে কোন অসুবিধা নেই যদি মায়ের কোভিড পজিটিভ হলেও করোনার কোন লক্ষন না থাকে। কারন করোনা ভাইরাস বুকের দুধের মাধ্যমে ছড়ায় না। তবে মা ও নবজাতক শিশুকে অবশ্যই সাস্থ্যবিধি মেনে অর্থাৎ হাত-মুখ-স্তন ধুয়ে, মাস্ক পরে বুকের দুধ দেওয়া যেতে পারে। তবে আক্রান্ত মায়ের যদি করোনার লক্ষন বিরাজমান থাকে তাহলে মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাকে সবসময় দূরে রাখতে হবে এবং মায়ের দুধ বের করে বাটি-চামচে করে খাওয়ানো উত্তম বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগন।
প্রশ্ন : তাহলে নবজাতক শিশুটিকে করোনা টেস্ট করাতে হবে কিনা?
ডা. কবীর : হ্যা করাতে হবে। তবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো নবজাতক শিশুটিকে ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে করোনা টেস্ট করাতে হবে অর্থাৎ জন্মের প্রথম এক মাসের মধ্যে তাকে ৪ বার টেস্ট করাতে হবে। এছাড়া করোনা আক্রান্ত মায়ের নবজাতক শিশুটিকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত হাসপাতালে অবজারভেশনে রাখতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন : এ ক্ষেত্রে নবজাতক শিশুকে টিকা প্রদানের ব্যাপারে আপনার কি পরামর্শ?
ডা. কবীর : জী হ্যা অবশ্যই সমতময়ত ও নিয়মিত সব নবজাতককেই টিকা দিতে হবে। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। শিশুর ৪৫ দিন বা দেড় মাস বয়স থেকে নিয়মিত টিকা দেওয়া আবশ্যক। কারণ টিকা শিশুকে জটিল ও কঠিন রোগসমূহ থেকে সুরক্ষা দেয়। নইলে ঐ শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে বা কমে যেতে পারে। ফলে সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখেও পতিত হতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে টিকা দিতে হবে। এটা খেয়াল রাখতে হবে যে বাচ্চাসহ নিজেদের এবং টিকা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীকেও স্বাস্থ্যবিধি মানাটা খুবই জরুরী। সেজন্য আগে থেকেই টিকা প্রদানের স্থান, তারিখ, সময় জেনে স্বল্প সময়ের মধ্যে শিশুকে টিকা দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে,লকডাউনের কারণে যদি ঘর থেকে বের হতে না পারা যায় তবে শিশুর ৬ মাস বয়সের মধ্যে যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে টিকা শুরু করা যেতে পারে এবং ২৮ মাসের ভিতরে সকল টিকা সম্পন্ন করার জন্য বিশেষজ্ঞগন মতামত দিয়েছেন।
বাংলার গেজেট/ এম এইচ