করেনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা অনেক অভিভাবক জানিনা শিশুর ব্যাপারে কি কি করোনীয়। তারাই এখন সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কুষ্টিয়া ও রাজশাহীতে ৪৫ দিন বয়স্ক দুইটি শিশু হাসপাতালে মমূর্ষ অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন।
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের শিশু বিভাগের নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল কবীর। তিনি এমবিবিএস ও ডিসিএইচ ডিগ্রীধারী। মালয়েশিয়া থেকে শিশুরোগের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি কয়েক পর্বে শিশুদের জন্য করোনায় করোনীয় সর্ম্পকে অনলাইন পোর্টাল “বাংলার গেজেট” সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো :

করোনায় শিশুর যত্ন

প্রশ্ন : শিশুদের করোনার প্রাদুর্ভাব কেমন?
ডা. কবীর : বড়দের তুলনায় শিশুদের করোনার প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে কম। সাধারণত: ০-৯ বছর বয়সীদের অনেক কম বলা যায়। তবে অপুষ্ট শিশু বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যাদের তারা করোনার ঝুঁিকতে আছে বৈকি। তবে ইদানিং করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এবং ভারতীয় ডেল্টা ভেরিয়েন্টের মারাত্মক প্রকোপে শিশুরাও করোনার মহামারীতে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। সাধারনত: বয়স্কদের থেকে শিশুদের করোনার উপসর্গগুলো কম হয় এবং সামাম্য প্রাথমিক চিকিৎসাতেই স্বুস্থ্য হয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন : করোনাকালে শিশুদের কিভাবে যত্ন নিতে হবে?
ডা. কবীর : শিশুদের ক্ষেত্রে অভিবাবকরা একটু সর্তক থাকতে হবে। এ সময় সাধারণ ভাবে করণীয় :
ক) বাসায় অবস্থান করাতে হবে। একান্ত প্রয়োজন না হলে বাইরে নিয়ে যাবার দরকার নেই অর্থাৎ ভীড় এড়িয়ে চলাটাই শ্রেয়।
খ) বড়রা বাইরে থেকে এসেই বাচ্চাকে স্পর্শ না করা। হাত ধুয়ে জামা-কাপড়-জুতা চেঞ্জ করে পরিষ্কার হবার পরই বাচ্চাকে কোলে নেওয়া উত্তম।
গ) বড় শিশুদেরকে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলানো উচিৎ।
ঘ) হাত যেন চোখে মুখে না লাগায় সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে।
ঙ) হাচি-কাশির সময় হাত বা কনুই দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া উচিৎ।
চ) ঘরের আসবাবপত্র, বিছানা, টয়লেট, রান্নাঘর ইত্যাদি সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
ছ) পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়াতে হবে। ছোট বাচ্চাদের বুকের দুধ নিয়মিত পান করাতে হবে।
জ) এ সময় শিশুদের গালে-মুখে চুমু দেওয়া অনুচিত।
ঝ) শিশুদের খেলার জিনিসগুলো প্রতিদিন পরিষ্কার করে দিতে হবে।
প্রশ্ন : বাসার কেউ করোনা আক্রান্ত হলে শিশুদের জন্য করনীয় কিছু আছে কি?
ডা. কবীর : এই রকম পরিস্থিতি হলে বাচ্চাদেরকে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দুরে রাখতে হবে। যদিও বা এটা খুবই দুরহ ব্যাপার। বাচ্চাকে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে, করোনার কোন লক্ষন দেখা দিলো কিনা। সে রকম হলে দেরী না করে চিকিৎসারর ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশ্ন : শিশুরা করোনা আক্রান্ত কিনা তা কিভাবে বোঝা যাবে?
ডা. কবীর : প্রথমত: সবসময় এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত: করোনার লক্ষন চিহ্নিত করতে হবে। যেমন – হালকা জ্বর, সর্দি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, শ্বাসকস্ট (ঘন ঘন নিশ্বাস নেওয়া, বুকের খাচা বসে যাওয়া), মুখ দিয়ে লালা ঝরা, ঠোট মুখ লাল হয়ে যাওয়া, বিরক্তি ভাব, নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি।

 

করোনার উপসর্গদেখা দিলে যত্ন নিন শিশুর

প্রশ্ন : করোনার এ রকম লক্ষন দেখা দিলে করনীয় কি?
ডা. কবীর : বাচ্চাকে কাছাকাছি হাসপাতালে নিতে হবে। জরুরী স্বাস্থ্যসেবা নাম্বারে ফোন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। পরিচিত চিকিৎসকের কাছ থেকেও পরামর্শ ও করনীয় জেনে নেওয়া যেতে পারে। দরকার হলে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা গ্রহন করা যেতে পারে।
প্রশ্ন : বাচ্চাদেরকে করোনা টেস্ট করানোর প্রয়োজন আছে কি?
ডা. কবীর : হ্যাঁ টেস্ট করানো লাগতে পারে যদি পরিবারের কেউ করোনা পজিটিভ হয়। দ্বিতীয়ত: করোনার কোন উপসর্গ দেখা দিলে। অনেক অভিভাবকগন করোনা টেস্টের ক্ষেত্রে অযথা শংকিত থাকেন এই ভেবে যে, বাচ্চা ভয় পাবে কিনা, ব্যথা পাবে কিনা, কোন পাশ্বপ্রতিক্রিয়া হবে কিনা ইত্যাদি।
প্রশ্ন : এখনকার করোনাকালে প্রতিবন্ধি শিশুদের চিকিৎসা সম্মন্ধে আপনার পরামর্শ কি?
ডা. কবীর : আসলে এই সময়ে প্রতিবন্ধি শিশুরাই বেশী ঝুকির মধ্যে রয়েছে। যেমন : শিশু মৃগীরোগী, সেরেব্রাল পালসি শুশু, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত শিশু, বোবা-বধির শিশু, মানিসিক বিকারগ্রস্ত শিশু ইত্যাদি শিশুরা এই ঝুকিতে আছে। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম, অল্পতেই তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। কাজেই তাদের টেক কেয়ারটা খুবই জরুরী। তাদের যে কোনো শারীরীক সমস্যা দেখা দিলেই সংগে সংগে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা করা, বেশী মানুষের সংস্পর্শে না নেওয়া, মাস্ক পরানো, হাইজিন মেইনটেইন করানো খুবই জরুরী।
প্রশ্ন : শিশুদের মাস্ক পরার ব্যাপারে আলাদা কোন নিয়ম আছে কি? অথবা তাদের মাস্ক পরাটা কি খুব জরুরী?
ডা. কবীর : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মতে সাধারনত: ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাস্ক না পরলে চলবে। কারন তাদের মাস্ক পরানোটা বেশ কঠিন কাজ। এখন আবার কোন কোন বিশেষজ্ঞগন বলছেন যে ২ বছরের বেশী শিশুদেরকে মাস্ক পরানো উচিৎ। তবে এই সময়ে শিশুদের বাইরে বের না করানোটাই উত্তম। পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলাটা জরুরী।
প্রশ্ন : শিশুদের হাত ধোয়ার ব্যাপারে কি পরামর্শ দেবেন?
ডা. কবীর : হাত ধোয়ার ব্যাপারে ডঐঙ-র গাইডলাইন অনুসারে ৬টা ধাপে হাত ধুতে পারলে সেটাই উত্তম। এটা ছোট-বড় সবার জন্য প্রযোজ্য। তবে সহজে বলতে গেলে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাতের তালু, উলটা পিঠ, আংগুলের ভাজে ভাজে কচলিয়ে হাত ধুতে হবে। শিশুদেরকেও এভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে। হাত ধোয়ার এই অভ্যাসটা কেবলমাত্র করোনার এই সময়ের জন্য নয়, সারাজীবনে এভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসটা বজায় রাখা উচিৎ।
(আগামী মঙ্গলবার প্রকাশিত হবে সাক্ষাৎকারের পর্ব-২)